Home » Uncategorized » কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ খাতে বিনিয়োগের সম্ভাবনার প্রেক্ষিতে বাস্তব সমস্যা
  • কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ খাতে বিনিয়োগের সম্ভাবনার প্রেক্ষিতে বাস্তব সমস্যা

    পদ্মানদী বিস্তীর্ণ জলরাশিবেষ্টিত বিপুল সম্ভাবনাময় বরেন্দ্রভূমি রাজশাহী জেলার আয়তন ২,৪০০বর্গকিমি। এ জেলার জমির পরিমাণ প্রায় ২৪২,০০০ হেক্টর, যার মধ্যে প্রায় ১৫৭,০০০হেক্টর জ‌মি আবা‌দি ও সেচ সুবিধাপ্রাপ্ত। ৮,০০০ কিঃমিঃ রাস্তার অধিকাংশই পাকা ও আধাপাকা। রেলপথ রয়েছে ৭৩ কিঃমিঃ এবং নদীপথ ৯৭ কিঃমিঃ। বিমানবন্দর রয়েছে ১টি।

    উত্তরাঞ্চলের জন্য সবচেয়ে বড় সুযোগ হলো কাঁচামাল এখানেই উৎপাদন হয়। কিন্তু বাস্তবতা হলো, কৃষক ধান-আম-ইত্যাদি পণ্য উৎপাদনের ন্যায্য দাম পান না আর স্থানীয় শহরের বিনিয়োগকারীগন ভয় পান কারখানা করতে।

    কেন?

    কৃষিসহ যে কোন উন্নয়নের পূর্বশর্ত নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও গ্যাসের সরবরাহ যার কোনটাই এখানে নেই। কিন্তু আমাদের যোগাযোগের সুবিধার জন্য রয়েছে রাস্তাঘাট এবং উন্নত পরিবহন ব্যবস্থাসহ যথোপযুক্ত অবকাঠামো। যমুনা ব্রিজের কল্যাণে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের অন্যান্য অঞ্চলে সহজ যোগাযোগ ব্যবস্থা স্থাপিত হয়েছে। ফলে কৃষি ও কৃষিজাত পণ্য দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে পরিবহন সহজতর হওয়ার পাশাপাশি অন্য এলাকা হতে নানা উপকরণ এই জেলায় নিয়ে আসাটা সহজ হয়েছে। এছাড়া গোদাগাড়ি উপজেলার সুলাতানগঞ্জে নির্মাণাধীন নৌবন্দর রাজশাহীতে আন্তর্জাতিক ব্যবসা সম্প্রসারণে নতুন মাত্রা যোগ করছে। ফলে সম্ভাবনা দেখা দিতে শুরু করেছে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ।

    শিক্ষানগরী হিসেবে খ্যাত বিভাগীয় এই শহরে শিক্ষাখাতে বিনিয়োগে আগ্রহী অনেকে। ফলে কর্মসংস্থানের নতুন সম্ভাবনা দেখা দিতে শুরু করেছে রাজশাহীকে ঘিরে।

    নিকট ভবিষ্যতে কৃষি নির্ভর এ অঞ্চলে ক্রমেই ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার ঘটবে বলে আশা করা যায়। শিল্প-কারখানা স্থাপনের জন্য অন্য এলাকার তুলনায় রাজশাহীতে জমির মূল্য ও শ্রমিকদের মজুরি কম হওয়ায় বেসরকারি উদ্যোক্তারা রাজশাহীতে বিনিয়োগে আগ্রহী হয়ে উঠছেন দিন দিন।

    বিনিয়োগের সম্ভাবনাঃ কেন এখানেই টাকা ঢালা উচিত

    ১. কাঁচামালের বিশাল ভাণ্ডার – Supply Side সুবিধা___

    উত্তরাঞ্চল বাংলাদেশের খাদ্য ভাণ্ডার। এখানে জাতীয় উৎপাদনের:
    • আম ৪০% রাজশাহী-চাঁপাইনবাবগঞ্জ
    • আলু ৩০% বগুড়া-জয়পুরহাট
    • টমেটো ৩০% রাজশাহী-নাটোর
    • ভুট্টা ৬০% রংপুর-দিনাজপুর
    • পেঁয়াজ, মরিচ, ডাল: নাটোর-পাবনা
    • দুধ, মাংস, ডিম: পাবনা-সিরাজগঞ্জ-দিনাজপুর
    কাঁচামাল ঢাকা থেকে আনতে হয় না। কারখানার পাশেই হাট।

    ২. দেশীয় ও রপ্তানি বাজারের চাহিদা – Demand Side

    • দেশীয় বাজার@admin১৮ কোটি মানুষ। মিডল ক্লাস বাড়ছে, রেডি-টু-কুক-প্যাকেটজাত খাবারের চাহিদা বছরে ১৫% হারে বাড়ছে।
    আমের সিজন ২ মাস, কিন্তু জুসের চাহিদা ১২ মাস।

    • রপ্তানি বাজার@
    Middle East, UK, EU তে প্রবাসী বাঙালি + বিদেশিদের কাছে হালাল, অর্গানিক, ফ্রোজেন সবজি,ফ্রুট পাল্প, আচার,মসলার বিশাল চাহিদা।

    ৩. সরকারের নীতিগত সহায়তা@

    • কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণকে সরকার ”থ্রাস্ট সেক্টর” ঘোষণা করেছে।
    • রপ্তানিতে ২০% পর্যন্ত নগদ সহায়তা।
    • ৫-১০ বছরের কর অবকাশ সুবিধা আছে হাই-টেক পার্ক বা অর্থনৈতিক অঞ্চলে।• কৃষিতে বিদ্যুৎ বিলে ২০% রেয়াতের সুবিধা প্রান্তিক খামারি হলেও কিন্তু পণ্য প্রসেসরের ক্ষে‌ত্রে সেটা বাড়ানো হয়েছে।

    ৪. উচ্চ মূল্য সংযোজন – Value Addition@ |
    টমেটো ১ কে‌জি ৫ টাকা। সস বানালে ১ কেজি থেকে ২০০ টাকার পণ্য হয়। ১ কেজি আম ৪০-৬০ টাকা। পাল্প করে বিদেশে পাঠালে ৩০০ টাকা। এই লাভটা এখন ঢাকার কোম্পানি নিয়ে যায়। কারখানা উত্তরাঞ্চ‌লে হলে এই টাকা এখানেই থাকবে।

    বিনিয়োগকারী কেন ভয় পায় বাধা কোথায়?

    সমস্যা@

    ১. কর ও রাজস্ব নীতিঃ ফিড মিলের মতো প্রসেসিং শিল্পেও টার্নওভারের উপর ০.৬%-১% ন্যূনতম কর। লস করলেও কর দিতে হয়। ফলে লো-মার্জিন ব্যবসা যেমন ফ্রুট পাল্প, ডেইরি কারখানা শুরুতেই লসের মুখে পড়ে।
    ২. কাঁচামাল সরবরাহ কৃষক চুক্তিভিত্তিক চাষে অভ্যস্ত না। আজ দাম ১০ টাকা, কাল ২০ টাকা হলে কৃষক পণ‌্য বাইরে বিক্রি করে দেয়। কারখানা কাঁচামাল পায় না।
    ৩. রাজশাহী-রংপুরে গ্যাস নেই। ভয়াবহ বিদ্যুতের লোডশেডিং। কোল্ড চেইন নেই। যমুনা সেতুর উপর দুর্বল রেল যোগাযোগ ব্যবস্থা। যার কারণে প্রসেসিং খরচ ২৫-৩০% বেড়ে যায়। ঢাকার সাথে প্রতিযোগিতায় টেকা যায় না।
    ৪. ব্যাংক কৃষি প্রসেসিংকে উচ্চ ঝুঁকির খাত ধরে। জমি মর্টগেজ ছাড়া লোন দেয় না। সুদের হার ১২-১৪%। এ কারণে SME উদ্যোক্তারা শুরুই করতে পারে না। বড় কর্পোরেট ছাড়া কেউ আসে না।
    ৫. ফুড টেকনোলজিস্ট, কোয়ালিটি কন্ট্রোল, দক্ষ মেশিন অপারেটর উত্তরাঞ্চলে পাওয়া কঠিন।
    ৬. স্থানীয় ব্র্যান্ডের প্রতি মানু‌ষের আস্থা কম। মডার্ন ট্রেড -স্বপ্ন, আগোরা, ইউনিমার্ট – এ ঢুকতে বড় অংকের তালিকাভুক্তি ফি লাগে। উৎপাদন করেও বিক্রি করতে পারে না। তার উপর আবার সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য।
    ৭. মরন ফাঁদ: ভয়াবহ মরণ ফাঁদ কর নীতিতে, আর সুযোগটা হলো কাঁচামালে। তাই সমাধানও দুই দিকেই লাগবে।

    সরকারের করণীয়___

    ১. ন্যূনতম কর সংস্কার@
    কৃষি প্রসেসিং খাতকে ৫ বছরের জন্য ন্যূনতম কর থেকে অব্যাহতি দেওয়া। লাভের উপর কর, টার্নওভারের উপর না।

    ২. অ্যাগ্রো-প্রসেসিং জোন@
    রাজশাহী, বগুড়া, রংপুরে গ্যাস-বিদ্যুৎ-রাস্তাসহ বিশেষ জোন করা, যেখানে ওয়ান-স্টপ সার্ভিস থাকবে।

    ৩. কন্ট্রাক্ট ফার্মিং আইন@
    কৃষক-কোম্পানি চুক্তি যাতে আদালতে গ্রহণ‌যোগ‌্য হয়, সেই আইন করা।

    আমরা সচেতনভবেই জানি এনবিআরকে এবার যে লক্ষ্য দেওয়া হয়েছে, তার পেছনে মূলত IMF এর শর্ত। IMF বলছে প্রতি বছর ট্যাক্স-টু-জিডিপি রেশিও ০.৫% হারে বাড়াতে হবে। তারই ধারাবা‌হিকতায় এনবিআর এবার উৎসে কর থেকেই অতিরিক্ত ২২,৬৯০কোটি টাকা আদায়ের টা‌র্গেট নিয়েছে।

    এই টাকা আদায় করা সবচেয়ে সহজ__
    যারা সিস্টেমে আছেন, মধ্যবিত্ত ব্যবসায়ী সমাজ যাদের ট্রেড লাইসেন্স আছে, ব্যাংকে লেনদেন করেন – মানে আপনি-আমি।

    বড় কর্পোরেটের পেছনে বড় ল ফার্ম, আর একদম ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা তো সিস্টেমের বাইরে। মাঝখানে আমরা-আপনারা যারা না পারেন ফাঁকি দিতে, না পারেন লড়াই কর‌তে। তাই স্বাভাবিকভাবেই আমরা-আপনারা সফট টার্গেট।

    ২. কেন মধ্যশ্রেণীই টার্গেট?
    পরিসংখ্যানটা বলে এনবিআর যত কর আদায় করে তার মাত্র ৩৬.৪০% আসে ধনী বা সামর্থ্যবান শ্রেণীর প্রত্যক্ষ কর থেকে আর ৬৩.৬০% আসে সাধারণ মানুষের পরোক্ষ কর থেকে।

    অর্থ্যাৎ সিস্টেমটা এমনভাবে বানানো যাতে ভ্যাট, TDS, ন্যূনতম করের নামে আগেই টাকা কেটে নেওয়া যায়।
    • বড় ব্যবসায়ী: কর অবকাশ, বন্ড সুবিধা, ট্রান্সফার প্রাইসিং-অনেক রাস্তা আছে।
    • ছোট হকার/ফুটপাত: তাদের TIN ই নেই, ধরার উপায় নেই।
    • মধ্যবিত্ত ব্যবসায়ী: আপনার-আমার দোকান আছে, গোডাউন আছে, আমদানি করেন, ব্যাংকে LC করেন। আপনাকে নোটিশ দিলে আপনি দৌড়াবেন, কারণ ব্যবসা বন্ধ হয়ে যাবে এই ভয়ে।

    সরকার পক্ষ আগে একবার বলে‌ছিল দেশের কোটির বেশি খুচরা বিক্রেতাকে আইনের জালে আনা সম্ভব না, তাই দায় চাপানো হবে উৎপাদনকারী বা পাইকারির ঘাড়ে। এই লজিকেই এখন চাপটা নিচের দিকে আসছে।

    এই কারণেই ব্যবসায়ীরা বলছেন: এটা রাজস্ব আদায় না, হয়রানি।

    নানা কারণে বেসরকারী বিনিয়োগ নেতিবাচক ধারায় চলছে। দেশে কর্মসংস্থানও বল‌তে গে‌লে থমকে পড়েছে। গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে জিডিপি’র লক্ষ্যমাত্রা ২৬% থাকলেও অর্জন মাত্র ২২%।

    উদ্যোক্তাদের দিয়ে এ ধরণের উদ্যোগ নেয়াতে হলে অবশ্যই উল্লে‌খিত বিষয়ে নজর দিতে হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *