এবারের বাজেটটা এসেছে একটা কঠিন সময়ে। অর্থনীতিতে একসাথে চলছে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ধীর প্রবৃদ্ধি, ডলারের চাপ আর ব্যাংকিং খাতের অনিয়ম। ফলে বাজেটটা শুধু আয়-ব্যয়ের হিসাব না, বরং “অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার ও সামাজিক আস্থা পুনর্গঠনের নীতিপত্র” হয়ে দাঁড়িয়েছে। ১. রান্নাঘর আর বাজারের ঝুড়িতে চাপ সবচেয়ে বড় বাস্তবতা হলো মূল্যস্ফীতি। এখনো মূল্যস্ফীতি সাড়ে ৮% এর বেশি, সরকার এটাকে সাড়ে ৭% এ নামাতে চায়। কিন্তু চাল, ডাল, তেল, চিনি, মাছ-মাংস—সবকিছুর দাম নিয়ে চাপে আছে সাধারণ মানুষ। দুই বছর ধরেই খাদ্যের মূল্যস্ফীতি উচ্চ পর্যায়ে, নিম্ন আয়ের মানুষের ওপর চাপ সবচেয়ে বেশি। বাজেটের পরীক্ষাটা তাই হবে বাজারে। যদি আমদানি শুল্ক কমে, কৃষিতে সহায়তা বাড়ে, তাহলে দাম কমতে পারে। আর যদি রাজস্ব বাড়াতে নতুন ভ্যাট-শুল্ক বসে, তাহলে ঝুড়ির খরচ আরও বাড়বে। ২. মধ্যবিত্তের কপালে ৪ ধাক্কা বাজেটের প্রভাবে মধ্যবিত্তের খরচ বাড়তে পারে ৪টা জায়গায়: বিদ্যুৎ-ইউটিলিটি বিল, মোবাইল-ইন্টারনেট খরচ, ব্যাংকিং চার্জ ও ডিজিটাল লেনদেন, আর উবার-পাঠাওয়ের মতো দৈনিক যাতায়াত। এর পেছনে বড় কারণ ভর্তুকি কমানো। গত বছর প্রতি ১০০ টাকায় ভর্তুকি ছিল ১৯.১ টাকা, এবার সেটা ১৬.৫ টাকা।

বিদ্যুৎ খাতের ট্যারিফ বৃদ্ধি আর আইএমএফের শর্তে জ্বালানি ভর্তুকি যৌক্তিকীকরণের কারণে এটা হচ্ছে। ভর্তুকি কমলে কৃষি সেচ, গণপরিবহন, শিল্প উৎপাদন—সবখানে খরচ বাড়ে, শেষমেশ খেসারত দেয় দিনমজুর বা সীমিত আয়ের মানুষ। ৩. আয়, চাকরি আর ক্রয়ক্ষমতা মধ্যবিত্তের প্রকৃত আয় কমেছে, নিম্ন আয়ের মানুষের ক্রয়ক্ষমতা সংকুচিত হয়েছে, তরুণদের কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা বেড়েছে। আবার পোশাক খাতের রফতানি ৩.৪১% কমেছে, ৩ বছরে ৪০০ কারখানা বন্ধ হয়েছে। এগুলো সরাসরি ৪ কোটি মানুষের জীবিকার সাথে জড়িত। তবে বাজেটে উৎপাদন, কর্মসংস্থান, কৃষি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও সামাজিক নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দেয়ার কথা বলা হয়েছে। প্রতিবন্ধী ভাতা ৯০০ থেকে ১০০০ টাকা করা, মেট্রোরেলে ২৫% ছাড়ের মতো ঘোষণা আছে। ৪. সবাই করদাতা, বাজেট সবার খাতা আপনি আয়কর না দিলেও কর দিচ্ছেন। মোবাইল, ইন্টারনেট, সাবান, শ্যাম্পু, রেস্টুরেন্ট, পরিবহন—সবখানে ভ্যাট আছে। তাই বাজেটে ভ্যাট-শুল্কের সামান্য পরিবর্তনও রিকশাচালক থেকে শিল্পপতি সবার পকেটে প্রভাব ফেলে। ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেটে আয় ধরা হয়েছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি। আড়াই লাখ কোটি টাকার ঘাটতি মেটাতে হবে ঋণ দিয়ে, যা ভবিষ্যতে জনগণের অর্থেই শোধ করতে হবে। সারকথা বাজেটের আসল বিচার সংসদের করতালিতে না, মানুষের রান্নাঘর, বাজারের ঝুড়ি আর সংসারের হিসাবের খাতায়। এবারের বাজেটের মূল দর্শন “উৎপাদন, কর্মসংস্থান ও সামাজিক ন্যায়ভিত্তিক অর্থনীতি”—যেখানে লক্ষ্য সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার চাপ কমানো। কিন্তু বাস্তবায়নই বড় চ্যালেঞ্জ।
If you enjoyed this article please consider sharing it!
We make simple and easy to WordPress themes that will make your website easily. You just need to install the theme on your website will be ready within a minute.
Developed by SaaSpot LLC